হুমায়ূন আহমেদের ‘নবিজী’

হুমায়ূন আহমেদের ‘নবিজী’ - ছবি : সংগ্রহ
হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী। স্বাধীনতা পরবর্তী অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর ভাষায়, ‘হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছে।’ ছোটছোট বাক্য আর সহজ ভাষায় লিখেছেন প্রায় চার দশক ধরে। রয়েছে প্রায় তিন শতাধিক বই। ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বেশি জনপ্রিয় হলেও লিখেছেন বেশকিছু সায়েন্স ফিকশন। বাদ যায়নি স্মৃতিকথা ও ভ্রমণ কাহিনী। তার লেখায় রসবোধ, সেন্স অব হিউমার, রহস্য ও সঠিক-উপাত্ত থাকায় সহজেই পাঠককে আকৃষ্ট করে। তাকে বলা হয়, বাংলা কথাসাহিত্যে সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। নগর জীবনের পটভূমিতে তার বেশির ভাগ উপন্যাস রচিত হলেও গ্রামীণ জীবনের চিত্রও ফুটে উঠেছে গভীর মমতায়।
মুহাম্মদ সা: আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রাসূল। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। একমাত্র অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কারণে সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারতেন। মৃত্যুর প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর পরও তার ব্যক্তিত্ব মানুষকে চুম্বকের মতো টানে। এখন শুধু তাঁর অনুসারীরাই নয়, অনেক বিধর্মীও তাঁর প্রতি অনুরক্ত। তাঁকে নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই।
সিরাতের ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সিরাত শাস্ত্রের ওপর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রাচীন, প্রামাণ্য ও গ্রহণযোগ্য সীরাতগ্রন্থ ‘আস সীরাতুন-নাবাবিয়্যাহ লি ইবনে ইসহাক।’ বাংলায় অনুদিত হয়ে যেটি ‘সীরাত ইবনে ইসহাক’ নামে পরিচিত। সিরাত শাস্ত্রের ওপর আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইসহাক ইবনে ইয়াসার রাহ: সর্বপ্রথম সিরাত রচনা করেন বলে তাকেই সিরাত শাস্ত্রের জনক বলা হয়। সিরাত লেখার ধারা এখনো চলমান।
হুমায়ূন আহমেদের ভাষ্য, ‘আমার মতে পৃথিবীর তাবৎ ঔপন্যাসিক যাঁর কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তার নাম দস্তয়ভস্কি। আরেকজন আছেন মহামতি টলস্টয়। এক রেলস্টেশনে যখন টলস্টয় মারা গেলেন, তখন তখন তাঁর ওভারকোটের পকেটে একটি বই পাওয়া গেছে, তার নাম Sayings Of Prophet। বইটি ছিল টলস্টয়ের খুব প্রিয়। সময় পেলেই পড়তেন। বইটিতে মুহাম্মদ স.-এর বিভিন্ন সময়ে বলা ইন্টারেস্টিং কথাগুলো গ্রন্থিত’। প্রিয়নবীর প্রতি হুমায়ূন আহমেদের ভক্তি-শ্রদ্ধা কম ছিল না। যদিও তার কিছু কথা ও লেখায় বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। অনেকটা সংশয়বাদী বলা হলেও শেষ জীবনে তার উপলব্ধি ভিন্ন বলেই অনেকে মনে করেন।
মানবতার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মুহাম্মদ সা:-এর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি ‘নবিজী’ লেখা শুরু করেন। লেখার শুরুতেই তিনি বলেন, ‘যে মহামানব করুণাময়ের এই বাণী আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন, আমি এক অকৃতী তাঁর জীবনী আপনাদের সামনে লেখার বাসনা করেছি। সব মানুষের পিতৃঋণ-মাতৃঋণ থাকে। নবিজীর কাছেও আমাদের ঋণ আছে। সেই বিপুল ঋণ শোধের অক্ষম চেষ্টা’। যদিও তিনি পুরো লেখাটি শেষ করে যেতে পারেননি। নবিজীর জীবনী লেখা শুরু করার পেছনে যেমন রয়েছে আকস্মিক পট পরিবর্তনের কথা ঠিক তেমনি শেষ করতে না পারার পেছনেও রয়েছে কিছুটা ছেলেমানুষি।
বাংলাবাজারে অন্যপ্রকাশের যে স্টলটি আছে সেটি উদ্বোধনের জন্য হুমায়ূন আহমদকে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের দেশের রীতি অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা শুভ কাজ সূচনার প্রাক্কালে মিলাদ কিংবা প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। অনেক পুরনো রীতিই বলা চলে। মূলত কাজ কিংবা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য লাভই এর উদ্দেশ্য। যথারীতি তিনি ফিতা কেটে স্টলের উদ্বোধন করেন। এরপর মুনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। মিলাদে আগত মাওলানা সাহেবের মুনাজাতে হুমায়ূন আহমেদ খুবই প্রাণিত হলেন, অবাক হলেন এবং তার সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এক মাওলানা সাহেব প্রার্থনা করলেন। আমি খুবই অবাক হয়ে তার প্রার্থনা শুনলাম। আমার কাছে মনে হলো, এটি বইপত্র সম্পর্কিত খুবই ভালো ও ভাবুক ধরনের প্রার্থনা। একজন মাওলানা এত সুন্দর করে প্রার্থনা করতে পারেন যে আমি একটা ধাক্কার মতো খেলাম। মাওলানা সাহেবকে ডেকে বললাম, ‘ভাই, আপনার প্রার্থনাটা শুনে আমার ভালো লেগেছে।’ মাওলানা সাহেব বললেন, ‘স্যার, আমার জীবনের একটা বড় আকাক্সক্ষা ছিল আপনার সাথে একদিন দেখা হবে। আল্লাহ আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছে।’ আমি তার কথা শুনে বিস্মিত হলাম। আমি বললাম, ‘এই আকাক্সক্ষাটি ছিল কেন?’ মাওলানা সাহেব বললেন, ‘আপনার সাথে দেখা করতে চাই, কারণ আমি ঠিক করেছি, দেখা হলেই আপনাকে আমি একটা অনুরোধ করব।’
‘কী অনুরোধ শুনি?’
‘আপনার লেখা স্যার এত লোকজন আগ্রহ নিয়ে পড়ে, আপনি যদি আমাদের নবী করিমের জীবনীটা লিখতেন, তাহলে বহু লোক এই লেখাটি আগ্রহ করে পাঠ করত। আপনি খুব সুন্দর করে তাঁর জীবনী লিখতে পারতেন।’
মাওলানা সাহেব কথাগুলো এত সুন্দর করে বললেন যে আমার মাথার ভেতর একটা ঘোর সৃষ্টি হলো। আমি তার কাঁধে হাত রেখে বললাম, ‘ভাই, আপনার কথাটা আমার খুবই মনে লেগেছে। আমি নবী করিমের জীবনী লিখব।’ এটাই ছিল ‘নবিজী’ লেখার পেছনের গল্প। এরপরে তিনি লেখার জন্য যতেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। দেশী-বিদেশী, অনূদিত অনেক বই-ই সংগ্রহ করেন। কিন্তু তার পরেও কিছুটা ভয় উনার মাঝে কাজ করে। যদি কোথাও ‘একটু উনিশ-বিশ’ হয়ে যায়। যার কারণে তিনি একটু থেমে যান। যেহেতু নবিজীর জীবনী মানেই খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। ভুলের জন্য মাশুলও বেশি। বলতে গেলে কিছুটা অপরাধবোধের কারণেই একটু দূরত্ব সৃষ্টি করেন। তবুও তিনি শুরু করেছিলেন।
লেখা শুরুর ক্ষেত্রেও রয়েছে একটা গল্প। সব প্রস্তুতি থাকার পরও তিনি নবী জীবনী লেখা শুরু করতে পারেননি। করেননি। তিনি বলেন, ‘নাহ্, আমি লেখার কাজ শুরু করিনি। আমি অন্যদিন-এর মাসুমকে বললাম, ‘তুমি একটা সুন্দর কাভার তৈরি করে দাও তো। কাভারটা চোখের সামনে থাকুক। তাহলে আমার শুরু করার আগ্রহটা বাড়বে।’ মাসুম খুব চমৎকার একটা কাভার তৈরি করে দিলো। বইটার নামও দিলাম ‘নবিজী’। এরপরেই শুরু হয় আসল ছেলেমানুষি। আমরা জানি অনেকেই আমাদের প্রিয় নবীকে স্বপ্নে দেখেছেন। উনারও খুব ইচ্ছে প্রিয় নবীকে স্বপ্নে দেখার। আর ঠিক করেই নিলেন, রাসূলকে স্বপ্নে দেখলেই তিনি লেখা শুরু করবেন। এরকম হাস্যকর-ছেলেমানুষি প্রতিজ্ঞার ভেতরই ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তবে তিনি স্বপ্নে প্রিয়নবীকে দেখেছেন কি না সেই রহস্য ভেদ করে যাননি। তবে লেখাটি শুরু করেছিলেন। প্রবল আগ্রহ-আকাক্সক্ষা থাকার পরও লেখাটি তার শেষ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কারণ তত দিনে মরণব্যাধি ক্যান্সারের আক্রমণ তীব্র হয়ে ধরা দেয়।
অসমাপ্ত এই লেখায় তিনি অসাধারণ গদ্যশৈলীর পরিচয় দিয়েছেন। ঝরঝরে শব্দে, ছোট ছোট বাক্যে ইতিহাস ফিরে পায় প্রাণ। শব্দশৈলীর নান্দনিক গাঁথুনিতে আর গল্প বলার ঢঙে বাঙময় হয়ে উঠে এই লেখাটি। অর্ধফর্মার (‘লীলাবতির মৃত্যু’ বইয়ে সঙ্কলিত, যেটি তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়) অসমাপ্ত এই লেখা পাঠকের মনে তীব্র পাঠস্পৃহা জাগাতে সক্ষম হয়েছে।
আউজ আর তার কন্যা শামার হৃদয়বিদারক ঘটানার বর্ণনা দিয়েই লেখাটি শুরু করেন। শুরুতেই তিনি এমন এক পরিবেশের বর্ণনা দেন, যে পরিবেশে আসলেই একজন সংস্কারক প্রয়োজন। মূলত নবীর আগমনের প্রয়োজন এবং প্রেক্ষাপট উল্লেখ করতেই তিনি এমন বর্ণনা দেন বলে ধারণা করা হয়। গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ, মারামারি, হানাহানি, লুটপাট, কন্যাসন্তান হত্যাসহ নানা ঘটনার সংক্ষেপে বিবরণ দেন। এটিকে তিনি তখনকার সময়ের সাধারণ চিত্র বলেও উল্লেখ করেন। যদিও ইতিহাস আমাদের তাই সাক্ষ্য দেয়। প্রতিকূল এই পরিবেশে বেঁচে থাকার লড়াইকে তিনি ‘সারভাইবেল ফর দ্য ফিটেস্ট’ বলে উল্লেখ করেন। বেঁচে থাকার জন্য তাদের সবসময় দৌড়ের উপরই থাকতে হতো। থাকতে হতো সতর্ক। আর এভাবেই চলছিল জীবন। লেখকের ভাষায়- ‘এই ছোটাছুটির মধ্যেই মায়েরা গর্ভবতী হন। সন্তান প্রসব করেন। অপ্রয়োজনীয় কন্যাসন্তানদের গর্ত করে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়’।
এরপরে তিনি নবীর আগমনের বর্ণনা দেন। জন্মসংক্রান্ত অর্থাৎ তারিখ নিয়ে নানা বিতর্কের কথা উল্লেখ করেন। যদিও আমরা জানি নবিজীর জন্ম তারিখ নিয়ে প্রায় ১২টিরও বেশি মতামত রয়েছে। তবে আমাদের দেশে ১২ রবিউল আওয়ালই বেশি প্রচলিত। আদি জীবনীকারদের অনেকেই একেই রাসূলের জন্ম তারিখ বলে উল্লেখ করেন। তাই তিনিও সেই সূত্র ধরেই এগিয়েছেন। যদিও আধুনিক পঞ্জিকা মতে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার বলে স্বীকৃত নয়। এটিও তিনি বলতে দ্বিধা করেননি।
পিতৃহীন হয়ে জন্ম নেয়া শিশুর পাশে যিনিই প্রথম এসে দাঁড়ান তিনি হলেন দাদা আবদুল মোতালেব। তিনিই নাম দিলেন, ‘মোহাম্মদ’। যদিও সে সময় এমন নামের প্রচলন ছিল না। নবিজীর আগে এই নাম কারো ছিল বলে ইতিহাসবিদরা প্রামাণ পাননি। লেখকের ভাষায়- কাবার সামনে শিশুটিকে দু’হাতে ওপরে তুলে উচ্চকণ্ঠে বললেন, আমি এই নবজাত শিশুর নাম রাখলাম, মোহাম্মদ!
সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। নতুন ধরনের নাম। আরবে এই নাম রাখা হয় না। একজন বলল, এই নাম কেন? উত্তরে মোতালেব বললেন, মোহাম্মদ শব্দের অর্থ প্রশংসিত। আমি মনের যে বাসনায় নাম রেখেছি তা হলো- একদিন এই শিশু স্বর্গে ও পৃথিবীতে দুই জায়গাতেই প্রশংসিত হবে’। আসলে হয়েছেও তাই। মুহাম্মদ সা: চির অম্লান।
শিশু মুহাম্মদ সা: দুধ মা হালিমার ঘরে যায়। সেখানেই ঘটে নানা অলৌকিক ঘটনা। যে বুকে দুধ ছিল না সেই স্তন হঠাৎ পরিপূর্ণ, যে গাভীর ওলানে কোনো দুধ ছিল না সেই গাভীর ওলানও দুধে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ফিরে আসে আর্থিক সচ্ছলতা। যেদিকেই মুহাম্মদ সা:-কে কোলে নিয়ে যাওয়া হয় প্রখর সূর্যের নিচে এসে যায় মেঘের আচ্ছাদন। এরকম বর্ণনা দিতে দিতেই হঠাৎ থেমে যায় ‘নবিজী’ লেখা।