ইসরাইলের ৪ ক্ষতি

নেতানিয়াহু - ছবি সংগৃহীত
ইসরাইলকে নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ফিলিস্তিনকে মানতে হবে। চীন রাশিয়ার কঠোর অবস্থানে শেষ পর্যন্ত ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাতের দ্বি-জাতি সমাধানের পক্ষেই মত দিয়েছেন বাইডেন। তিনি বলেছেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিনের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর ‘এটাই একমাত্র সমাধান’। পাশাপাশি, বিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনে বড় আকারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় শনিবার থেকে পৌঁছাতে শুরু করেছে সাহায্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সাহায্য পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই সাহায্য গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা হামাসের কাছে নয়, পাঠানো হবে ইসরাইলের দখলকৃত পশ্চিম তীরস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে।
বাইডেন অবশ্য বলেছেন, “ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্নে দায়বদ্ধতার কোনো বদল হবে না।’ যতক্ষণ পর্যন্ত না ইসরাইলের অস্তিত্বকে ‘সর্বাত্মকভাবে’ এই অঞ্চলে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না।” ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের দ্বিজাতিভিত্তিক সমাধান নিয়ে বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। সর্বশেষ সঙ্ঘাতের পর এই সমাধানটি নিয়েই আবার নতুন করে কথা বলল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ; ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যেটিকে বিবেচনা থেকে একবারে বিদায় করতে চেয়েছিলেন। এবারের যুদ্ধে এর মধ্যে এই অঞ্চলের ভারসাম্য অনেকখানি পাল্টে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মেরুকরণে ইসরাইলপন্থীরা আঞ্চলিক অবয়ব দানের ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারিয়েছে। হামাসের সাথেই যেখানে ইসরাইল জয়ী হতে পারেনি, সেখানে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক হওয়ার স্বপ্নও তেলআবিবের বাস্তবায়ন হবে না বলে বিশ্বাস জন্মেছে। ট্রাম্পের সাথে এক তরীতে চড়ে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ভারসাম্য নষ্ট করেছেন নেতানিয়াহু। তিনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ সংহতি যেমন নষ্ট করেছেন তেমনিভাবে পররাষ্ট্র্র কৌশলের ভারসাম্য ভেঙে ফেলেছেন। ফলে এবার গাজার ওপর হামলায় যুক্তরাষ্ট্র্র ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো বিশ্ব শক্তির সমর্থন পাননি নেতানিয়াহু।
চীন এবং রাশিয়া এবারের মতো ইসরাইলবিরোধী কঠোর সতর্কবাণী আগে কখনো উচ্চারণ করেনি। ইসরাইল গাজায় হামলা অব্যাহত রাখলে এই সঙ্ঘাতে দ্বিমুখী হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। লেবাননের হিজবুল্লাহ ফ্রন্ট দিয়ে ইরান এবং তার মিত্ররা আর জর্দান ফ্রন্ট দিয়ে তুরস্ক পাকিস্তান ও মিত্র বলয়ের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। আর এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল যেখানে নিষ্ক্রিয় ওআইসিও প্রথমবারের মতো সক্রিয় হওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল।
এবারের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ফিলিস্তিন অ্যাজেন্ডাকে বিসর্জন দেয়ার যে আয়োজন চলছিল, সেটি আরো জোরালোভাবে ফিরে এসেছে। সামনে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে সময়ক্ষেপণের অবকাশ ইসরাইলের জন্য কমে যাবে। আর ফিলিস্তিনে আপসকামীরা কোণঠাসা হবে, ফিলিস্তিন স্বার্থের প্রকৃত ধারকরা জাতির নেতৃত্বে চলে আসবে।
যুদ্ধের পর-
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট এবারের যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাগোড়াই সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। ওলমার্টের মতে, এই লড়াইয়ে দু’জন বিজয়ী রয়েছেন : বহু ইসরাইলির মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা জাগিয়ে তুলতে পেরে হামাস জয়ী হয়েছে; আর বিবি নেতানিয়াহু, যিনি প্রথম মুহূর্ত থেকেই জানতেন যে হামাসের পতন ঘটবে না, তবে লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন এই কারণে যে যুদ্ধটি তার নিজস্ব ব্যক্তিগত অ্যাজেন্ডা বদলে দেবে।
নেতানিয়াহুর ‘ব্যক্তিগত অ্যাজেন্ডা’ আসলেই বদলেছে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই যুদ্ধ থেকে সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন লাভের যে প্রত্যাশা নেতানিয়াহু করেছিলেন, সেটি বাস্তবে পাবেন না। অধিকন্তু তিনি শেখ জাররাহসহ পূর্ব জেরুসালেম থেকে মুসলিম বসতি উচ্ছেদ করে ইহুদিদের পুনর্বাসনের যে পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন তাতে বাধার মধ্যে পড়বেন। এই প্রথমবারের মতো লড়াইয়ে সব সেক্টরেই নেতানিয়াহ বৈরিতার মুখে পড়েছেন। এর আগে ইসরাইলি আরবদের তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় আরব নাগরিকদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ফলে তারা ইসরাইলের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। এমনকি কোনো কোনো স্থানে আরব-ইহুদি দাঙ্গায় অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর ও নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা ইসরাইলের অভ্যন্তরে অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। গাড়ি চালানো, ছোটখাটো ব্যবসা বাণিজ্য ও শারীরিক শ্রমের কাজ আরবরা করার কারণে অনেক স্থানে তাদের উপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে ইসরাইলি সমাজের। এবারের ঘটনায় তাদের মধ্যে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটায় তার প্রভাব ইসরাইলি সমাজে পড়েছে।
জেরুসালেম ও পশ্চিম তীরের অধিকৃত অঞ্চলে ইসরাইলের প্রত্যক্ষ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। সেখানে ফিলিস্তিনি পুলিশ দিয়ে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর উচ্ছেদের প্রতিবাদকারীদের ধরে এনে ইসরাইলিরা নির্যাতন করে আসছিল। পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলোতে ইসরাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ভঙ্গের ফলে ফাতাহ আন্দোলন ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) ওপর সাধারণ ফিলিস্তিনিরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।
এর ফলে এবার আল আকসা ও শেখ জাররাহের ঘটনার পর পুরো পশ্চিম তীরজুড়ে গাজার প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি অভূতপূর্ব সমর্থন লক্ষ করা গেছে। যুদ্ধ চলাকালে ফিলিস্তিনিরা পুরো ফিলিস্তিন ভূখণ্ডজুড়ে ধর্মঘট পালন করেছে। বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদের পাশাপাশি ইসরাইলি সেনা ও পুলিশ কর্তৃক ধর্ষণের মতো কিছু জঘন্য ঘটনা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এবারের যুদ্ধে ইসরাইলের অনেক ক্ষতি সরাসরি সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, ইসরাইলের শক্তিমত্তা ও নিরাপত্তা সক্ষমতার ব্যাপারে যে ধরনের অতিলৌকিক ধারণা তৈরি হয়েছিল তা ভেঙে গেছে। হামাসের মতো একটি অরাষ্ট্রিক শক্তির সামনে যেভাবে ইসরাইলি নিরাপত্তা ভেঙে পড়েছে তাতে অন্য আরব রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধানে তারা বড় কিছু করতে পারবে, এমন আশা এখন আরব রাষ্ট্রগুলো খুব বেশি করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের নাগরিকদের প্রতি এতদিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে যে নিশ্চয়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়ে আসা হয়েছিল, তার সাথে বাস্তবতার বড় ধরনের ব্যবধান তারা প্রত্যক্ষ করেছে। ফলে ইসরাইলি সমাজে এর মধ্যে ভাঙন দেখা গেছে যার কারণে দুই বছরে চারটি নির্বাচন করার পরও টেকসই সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থার আরো অবনতি ঘটে ভেতর থেকে ইসরাইল রাষ্ট্র দুর্বল হতে থাকবে।
তৃতীয়ত, ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মেরুকরণ তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় মার্কিন নীতি উদ্যোগের সাথে একেবারেই একাত্ম হয়ে, চীন ও রাশিয়ার বেশ কিছু স্বার্থে ইসরাইল আঘাত করেছে। কাশ্মির ফ্রন্টে ইসরাইল সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে সহায়তা করেছে। দিল্লিকে যথেচ্ছ প্রতিরক্ষা সহায়তা দিয়েছে। সিরিয়ায় ক্রেমলিনের কথা না শুনে ইসরাইল আঘাত করেছে যা ইরানের সাথে মস্কোর সহযোগিতাকে ইসরাইলবিরোধী ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। আমেরিকার গোয়েন্দা তথ্য অনুসারে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে চীন ও রাশিয়া দুই বিশ্ব শক্তিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়তো। একই সাথে তুরস্কের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী মুসলিম দেশগুলোও ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি সঙ্ঘাতের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান কূটনৈতিকভাবে এই ইস্যুতে অনেক দূর এগিয়েও গিয়েছিলেন।
চতুর্থত, ইসরাইলের সাথে যে আরব দেশসমূহের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়েছে, সেসব দেশের জনমত, এবারের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি আলজাজিরা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারের ফলে, তীব্রভাবে বৈরী হয়ে উঠেছে। ফলে এসব দেশ ইসরাইলের সাথে সহযোগিতাকে বিস্তৃত করতে নানা ধরনের শঙ্কার মধ্যে থাকবে। নতুন কোনো দেশ আর ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বেশি আগ্রহ বোধ করবে না।
mrkmmb@gmail.com