বঙ্গ রাজনীতির অভিনব রসায়ন

মমতা ব্যানার্জি - ছবি : সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচন-উত্তর চুলচেরা বিশ্লেষণ তথা সকল পোস্ট মর্টেম-অন্তে আদতে একটাই কথা, মহিলা-মুসলমান এবং শিক্ষিত-ভদ্র ও অসাম্প্রদায়িক হিন্দু ভোটেই তৃণমূলের জয়জয়কার; রেকর্ড জয়- যাকে বলে ভূমিধ্বস জয়। কেন এই তিন শ্রেণীর মানুষের কথা বলা হচ্ছে!
ভোটের কম-বেশি পঞ্চাশ ভাগ মহিলা। দেশের একমাত্র নারী মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যের একজন নারী নেত্রীকে মেয়েরা আপন করেই নিয়েছে। এ ছাড়াও কেন্দ্র থেকে আগত বিজেপি নেতাদের মমতা-আক্রমণ ভালোভাবে নেয়নি এই অধিকাংশ মহিলা ভোটার- বাংলার মেয়ের অপমান, তাও বহিরাগতদের (পড়ুন, অবাঙালি) দ্বারা; বাঙালি নারীরা নিতে পারেনি। প্রশান কিশোরের বাংলা এবার ঘরের মেয়েকেই চায়; স্লোগানটি মেয়েদের মধ্যে ঝড় তুলতে পেরেছে। সর্বোপরি মেয়েদের জন্য কয়েকটি কর্মসূচি, যার মধ্যে কন্যাশ্রী অন্যতম- মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে জোড়া ফুল টানতে সক্ষম হয়েছে। উত্তর প্রদেশে মহিলা নির্যাতনের কয়েকটি চিত্র এবং যোগী আদিত্য নাথের আগমন এবং বক্তৃতাও সচেতন-শিক্ষিত মেয়েদের ভোট বিজেপিতে যায়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, বিজেপি রাজ্য সভাপতির মেয়েদের নিয়ে ক’খানা মন্তব্য।
দ্বিতীয়ত- মুসলমানপ্রধান এলাকায় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল; এটাই দীর্ঘদিনের জানা। কংগ্রেসের সেই দুর্গের পতন হয়েছে ২০২১-এর নির্বাচনে। কংগ্রেস রাজ্য রাজনীতিকে কোন ফ্যাক্টর নয়; এটাই হয়তো এলাকাবাসীকে ভাবিয়েছে। ফলে মুর্শিদাবাদসহ সকল মুসলিমপ্রধান এলাকায় তৃলমূল বাধাহীন-একক জয় পেয়েছে। জেলা বিবেচনায় তৃণমূল আর বিজেপির আসন, যদি দেখি- পশ্চিম মেদিনীপুরে ১৩-২, পূর্ব মেদিনীপুর ১০-৬, ঝাড়গ্রাম ৪-০, হাওড়া ১৬-০, হুগলি ১৪-৪, কলকাতা ১১-০, উত্তর ২৪ পরগনা ২৮-৫, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ৩০-০, নদিয়া ৮-৯, পূর্ব বর্ধমান ১৬-০, পশ্চিম বর্ধমান ৬-৩, পুরুলিয়া ৩-৬, মুর্শিদাবাদ ১৮-২, বাঁকুড়া ৪-৮, বীরভূম ১০-১, উত্তর দিনাজপুর ৭-২, দক্ষিণ দিনাজপুর ৩-৩, মালদা ৮-৪, কোচবিহার ২-৭, জলপাইগুড়ি ৩-৪, আলিপুরদুয়ার ০-৫, দার্জিলিং ০-৫। জেলাগুলোর মধ্যে মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুর মুসলিম প্রধান এলাকা। জনসংখ্যার দিক থেকে মুর্শিদাবাদে ৬৬, মালদাহে ৫১, উত্তর দিনাজপুরে ৫০, বীরভূমে ৩৭, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩৬, হাওড়ায় ২৭ ভাগ মানুষই মুসলমান- এসব জায়গায় তৃণমূল ভালো করেছে। উল্লেখ্য, রাজ্যের মোট জনসংখ্যার মোট ৩০ ভাগ মুসলমান এবং ভোটারের ২৭ ভাগ। এই মুসলিম ভোটারদের আশীর্বাদ তৃণমূলের ঝুড়িতে গেছে। একটি দেশে সংখ্যালঘুরা মূলত নিরাপত্তা চায়; যা বাম বা কংগ্রেস আর দিতে পারছে না। ৪৬ সালের পর থেকে এইই প্রথম বঙ্গের বিধানসভা বাম-কংগ্রেসহীন বসবে; বঙ্গ রাজনীতির নতুন এবং অভিনব রসায়ন।
তৃতীয়- শিক্ষিত হিন্দু ভোটারের কথা বলা হয়েছে; লক্ষ করুন কলকাতায় বিজেপি একটি আসনও পায়নি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হেরেছেন (কলকাতার বাইরে স্বপন দাশগুপ্তের মতো সাদা মনের ব্যক্তিও হেরেছেন)। কলকাতার খুব কম সংখ্যক এলাকাই মুসলিমপ্রধান। বরং এই শহরে বাঙালি-অবাঙালি মিলিয়ে বারো প্রকারের মানুষের বসবাস-সবাই সচেতন, অনেকেই শিক্ষিত; যারা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার মানে না। ফলে তৃণমূল একচেটিয়াভাবে কলকাতার আসনগুলো ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। কেউ কেউ মনে করে, মানুষ শিক্ষিত হলে বামেদের সুবিধে; কেরালার জন্য সেটা ষোলো আনাই ঠিক। নানা কারণে এই ধারণা বাংলায় খাটেনি এবারে।
চতুর্থত- শিক্ষিত-ভদ্র ও অসাম্প্রদায়িক হিন্দু শব্দযুগল সচেতনভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে- কলকাতায় তৃণমূল এজন্যই ভালো করেছে। হিন্দুপ্রধান গ্রামীণ এলাকায় তাকালেই ভিন্নটা চোখে পড়বে; কোচবিহারসহ কয়েকটি জেলায় বিজেপি ভালো করেছে এবং এই জায়গুলোই বিজেপিকে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হতে শক্তি জুগিয়েছে। ২০১৬’র ৩ আসন থেকে ৭৭ আসন- নিঃসন্দেহে বিজেপির বিশাল পাওয়া। নির্বাচনে বিজেপির প্রাপ্তি দু’টি- ৭৭ আসন পেয়ে বিরোধী শিবিরে বসা, বাম-কংগ্রেসকে হটিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভাব। আঙ্গুল দেখিয়ে ২০০ আসন পাওয়ার স্বপ্ন অধরাই থাকল এবারও। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, ২০০ আসন পাওয়া বিজেপির কেবল নির্বাচনী চাল ছিল। বিজেপির অন্য হারটা হচ্ছে, ২০১৯-এর জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত আসন এলাকায় কম-বেশি দেড়’শ বিধানসভার আসন ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতা। বিজেপি দলের সর্বভারতীয় সভাপতি, দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রের কয়েকজন মন্ত্রীকে এনেও রাজ্য শাসনের ভার পায়নি। কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে বিজেপি স্পষ্টত পশ্চিমবঙ্গের দখল পেতে মরিয়া ছিল। কারণটা সহজেই বোধগম্য। একটার পর একটা রাজ্য দখলের পরিকল্পনা আছে বিজেপির। দীর্ঘ বাম শাসনের পর ত্রিপুরা পেয়েছে বিজেপি। কংগ্রেস থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে অসম; একবার নয়, দু’বার। উত্তর প্রদেশে জোটকে হারিয়ে অনেকটাই চাঙা বিজেপি। সম্প্রতি বিহারেও বিজেপির জয়জয়কার। পেয়েছে পুদুচেরি। আবার কয়েকটি রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিধায়ক ভাগিয়ে সরকারে তারাই। ফলে এরই ধারাবাহিকতায় এবারের টার্গেট ছিল পশ্চিমবঙ্গ। স্লোগান উঠেছিল ডাবল ইঞ্জিনের সরকার হলেই ভালো। পশ্চিমবঙ্গে চোখ পড়ার অন্যকারণও আছে- লক্ষ্য ২০২৪-এ সাধারণ নির্বাচন।
সুতরাং বঙ্গের ৪২টি লোকসভার আসনই প্রকৃত নিশানা। ২০১৯-এর সাধারণ নির্বাচনে রীতিমতো অবাক করে দিয়ে বিজেপি বঙ্গে অভাবনীয় ফল করেছিল। সেবারে তৃণমূল থেকে মাত্র চারটি আসন কম পেয়েছে বিজেপি; তৃণমূল ২২, বিজেপি ১৮, কংগ্রেস ২। ভোটের শতকরা হারে যথাক্রমে ৪৩.৬৯, ৪০.৬৪, ৫.৬৭। আদতে সেই থেকেই পশ্চিমবঙ্গ দখলের স্বপ্নে বিভোর ভারতীয় জনতা পার্টি। তৃণমূলের দুর্নীতিকে তির করেই প্রচার নামে বিজেপি- প্রতিশ্রুতি ছিল সোনার বাংলা গড়ার।
অন্যদিকে তৃণমূল ভর করছিল তাদের উন্নয়ন ও নানা প্রকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে। জয়বাংলা স্লোগানে বাংলাকে বাংলা রাখতে চেয়েছিল মমতার দল। প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে হিন্দুত্ব আর বাঙালিয়ানা এক নয়Ñবিজেপি ক্ষমতায় আসলে হিন্দুত্বের তোড়ে হারিয়ে যাবে বাঙালিয়ানা; একটু বাড়িয়ে বললে, বিজেপি জাতপাতের রাজনীতি করছে এবং ক্ষমতায় আসীন হলে ধর্মীয় বিভাজন বেড়ে যাবে- নষ্ট হবে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি এবং ধর্মীয় সহ-অবস্থানের নজির ভেঙে পড়বে; হুমকিতে পড়বে শতবছরের বাঙালি সংস্কৃতি। এর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির ব্যক্তি ইমেজও কাজে লাগাতে মরিয়া ছিল তৃণমূল।
তৃতীয় শক্তি বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ কিছুই করতে পারেনি। কংগ্রেসের ক’জন হেভিওয়েট প্রার্থী এবং ক’জন বর্ষীয়ান নেতাও কোনো আসন ধরে রাখতে পারেনি- ইভিএম বক্স খোলার পর দেখা গেল সব ভোট জোড়া ফুলে। বামেদের বর্ষীয়ান নেতারাও নির্বাচনের স্রোতে হারিয়ে গেছে। বামেরা বিশেষত সিপিআইএম জনাকুড়ি তরুণ-তরণীকে প্রার্থী করেছিল। এদের প্রতিশ্রুতিশীল মনে হয়েছে; চোখে-মুখে স্বপ্ন। কেউ কেউ ভালো ভোট পেয়েছেÑ তবে এদের আরো আগে মাঠে পাঠালে ভালো হতো। কিন্তু বামেদের ওপর যেন নির্ভর করতে ভরসা হচ্ছে না আর; ৩৪ বছরের শাসন সকলের সামনে- ফলে তরুণরাও কেউ ঘুরে দাঁড়াতে পারল না। জোটের অন্যতম শরিক কংগ্রেস বঙ্গে প্রায় ক্ষয়িষ্ণু; সেটা মমতার কংগ্রেস ছেড়ে আসার পর থেকেই- কংগ্রেস আজও সেটা পুষিয়ে উঠতে পারেনি; বরং দিনে দিনে দুর্বল হয়েছে। যদিও কয়েকটি জেলায় কংগ্রেসের বাঁধা ভোটে অন্যরা তেমন ভাগ বসাতে সমর্থ হবে না মনে করলেও আদতে সেটা এবার টিকেনি। আর আব্বাসের দল আইএসএফ রাজনীতিতে একদমই নবীন বলে আলোচনায় আসছে না তেমন করে। ভোটে ঝড় তোলার বদলে একটি আসন নিয়েই খুশি থাকতে হচ্ছে প্রথমবারের মতো রাজনীতি ও ভোটে আসা আব্বাস সিদ্দীকি।
পশ্চিমবঙ্গে বিধান সভার নির্বাচনে একটা বিশেষ রসায়ন কাজ করে। সেটা বলার আগে দেখা যাক ২০১১ ও ২০১৬-এর বিধান সভার ফলাফল। ১৮ এপ্রিল থেকে ১০ মে ২০১১-এ নির্বাচনে বামদুর্গকে পরাভূত করে মমতার তৃণমূল ১৮৫, বামফ্রন্ট ১০৪, এনডিএ ৩ এবং স্বতন্ত্র ২ আসন পায়। ২০১৬-তে গিয়ে এই ফলাফল দাঁড়ায় তৃণমূল ২১১, সিপিআই ২৬, কংগ্রেস ৪৪, বিজেপি ৩, বাকিটা অন্য বামদল পেয়েছে। সে সময়ে বিজেপি বঙ্গে কেবল একটু একটু করে এগুচ্ছিলো; বস্তুত ২০১৯’র লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে শক্ত ভীত করে দিয়েছে এবং ২০২১ কে টার্গেট করেই নানা ফিকির করছে- তাই এবারের নির্বাচনে জিততে এক রকমের বদ্ধপরিকর ছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। মোদি এবং অমিত শাহ এতবার এসেছেন যে, রাজ্যে সরকার গড়তে না পারলে মান-সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে পড়বে এমনই ধ্যান-ধারণা ছিল রাজ্য নেতাদের। বরং এখন মনে হচ্ছে, অমিত-মোদি যতবার এসেছেন, ততবারই ভোট কমেছে। কেউ বলতেই পারে, হেলিকপ্টারের ডানা যতবার ঘুরছে, ততটাই ভোট হারিয়েছে বিজেপি নামের দলটির।
পশ্চিমবঙ্গে যারাই পূর্বতনদের হারিয়ে সরকার গঠন করেছে; প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বিশাল জয় লক্ষ করা যায়। অল্প মার্জিন নিয়ে জয় পাওয়ার নজির বড় বেশি নেই। এবং এ-ও দেখা গেছে, খুব খেপিয়ে না দিলে বঙ্গের লোকদের পরিবর্তন পছন্দ নয়; অর্থাৎ বড় কোন ঘটনা ব্যতিরেকে বঙ্গের রাজনীতিতে পরিবর্তন আসেনি। ২০১১ সালেও তৃণমূল পরিবর্তনের দাবি তুলেই সরকার গঠনে সক্ষম হয়েছে। এবার বিজেপিও পরিবর্তনের স্লোগান তুলেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৬৭ সালে কংগ্রেস প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত হয়। তার আগে রাজ্যজুড়ে প্রবল খাদ্যাভাব দেখা দেয়, সেটাই কাজে লাগায় বামদল। গড়ে তোলে খাদ্য আন্দোলন। মানুষের খাদ্যাভাসেও লাগাম টানতে উদ্যোগী হয়েছিল প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের কংগ্রেস সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর গম-কাঁচকলা খাওয়ার পরামর্শ অনেকের মনে থাকার কথা; ফলত খাদ্য আন্দোলনের তোপে হেরে যায় রাজ্যের কংগ্রেস সরকার। কিন্তু অচিরেই ভেঙে পড়ে কংগ্রেসকে হঠানো যুক্তফ্রন্ট সরকার। ৬৭-৭২ অস্থির সময় বঙ্গে- মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপনই কঠিন ছিল।
নকশাল আন্দোলন, শ্রেণীশত্রু খতম, লেখাপড়া শিকেয় ওঠা ইত্যাদি কারণে কংগ্রেস ১৯৭২ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হয়। ১৯৭৭ সালে আবার বামফ্রন্ট। কারণ, ইন্দিরার জরুরি শাসন। কথা বলার অধিকার হরণ, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বামেদের আবার ফিরিয়ে আনে। পরের ইতিহাস চোখের সামনেই-৩৪ বছরের বামশাসন। ২০১১-এ সেটার পতন কেন হলো? ৩৪ বছরের রাজত্বে বামেরা একটা বাম-ভাবাদর্শের ওপর নির্ভর করেছে এবং বাম চেতনা মানুষের মধ্যে ফেরি করেছে; মেনেও নিয়েছে অনেকে। কিন্তু কৃষকদের জমি কেড়ে নিয়ে শিল্প করার প্রচেষ্টা বামফ্রন্টের জন্য কাল হয়ে গেছে। রাজনীতির প্রাজ্ঞরা আজও মনে করেন, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনই বামেদের বিদায়ের ঘণ্টা বাজিয়েছে। তাহলে ১৯৬৭’র খাদ্য আন্দোলন, ১৯৭২’র নকশাল অরাজকতা, ১৯৭৭’র ইন্দিরার জরুরি দশা এবং ২০১১’র সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন ক্ষমতা বদলের নিয়ামক ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, ২০২১ এর আগে এমন কি ঘটেছে যে পরিবর্তন চাই! স্বভাবে সহনশীল বাঙালি কী কারণে পরিবর্তন চাইবে? বিশেষ কোন ঝড় তো বাংলায় আসেনি। ২০১১ থেকে ২০২১’র মধ্যে তেমন কোনো আন্দোলনও দানা বাঁধেনি।
তবে দুটো কারণ দেখা যায়; দুর্নীতি এবং শিল্পায়ন। দুর্নীতি ভোটারদের কাছে বড় কারণ বিবেচিত হলে ২০১৬ সালে তৃণমূলের পড়ে যাবার কথা; সে-সময়ে সারদা-নারদার মত তরতাজা নানা কিছুই চোখের সামনে ছিল। পশ্চিমবঙ্গে বেশির ভাগ মানুষের কাছে শিল্পায়ন জরুরি নয়, বিশেষত বামেরা যেভাবে বলতে চাইছে-তেমন হলে বামেরা ৩৪ বছর থাকল কী করে! আদতে এই দুটো কারণ বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে না; সরকার পড়ে যাওয়ার জন্য মুখ্য ছিল না, মানে পরিবর্তন অনিবার্য নয়-আর সেটাই হয়েছে। অন্যান্য কারণ অনুষঙ্গ হিসাবে কাজ করেছে মাত্র। যদিও বিদ্যুতের বেগে বিজেপির আগমন একটা বড় কারণ হতেই পারত। তারা আদা-জল খেয়েই লেগেছিল। বামেরা বেকারত্বের স্লোগান তুললেও তা গণদাবিতে রূপ নেয়নি।
নির্বাচনের ফলাফলে ভাবনার বিষয় হল, এক; হিন্দুত্ববাদী দলের দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে উত্থান। ওখানের বুদ্ধিজীবীগণ এটিকে অশুভ ইঙ্গিত বলেই মনে করছে। কেউ কেউ এও ভাবছে, এই দলই না আগামীতে রাজ্য দখল করে বসেÑতারা যে আরো নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগুবে সে আর নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয়ত; কংগ্রেসের তছনছ হওয়া নিয়ে তেমন উদ্বেগের বিষয় না হলেও বামেদের এভাবে দুমড়ে-মুচড়ে পড়া রাজ্যে-রাজনীতির জন্য ভালো কিছু নয়Ñকতিপয় শিক্ষিত সচেতনদের এমনই উদ্বেগ। তৃতীয়ত; কেন্দ্রীয় সরকার স্বয়ং এবং তাদের নানা অঙ্গকে যেভাবে রাজ্য নির্বাচনের কাজে ব্যবহার (পড়–ন, তৃণমূলের অভিযোগ যে, কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন কমিশন, রিজার্ভ বাহিনী, তদন্ত সংস্থাকে বঙ্গের এই নির্বাচনে ব্যাপকভাবে বিজেপির পক্ষে ব্যবহার করেছে) করেছে, তাতে আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন দুরূহ হবে।
শেষত; রাজনীতির মেরকরণ কী হবে! কেউ জানে না, রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপি নতুন কী খেলা খেলবে। এবার যা হোক দল বদল করিয়ে ভালো করা যায়নি। টাকার খেলা তো এখন অবশিষ্ট। তাহলে ২০২৬-এ এক- বিজেপি রুখতে তৃণমূলকে কী বাম-কংগ্রেস-আইএসএফকেও সঙ্গে নিয়ে লড়তে হবে? রাজ্য-রাজনীতি সেদিকে যাচ্ছে না তো!
আপাতত সবকিছুর ঊর্ধ্বে মমতা ব্যানার্জির লাল-সবুজের জোড়া ফুলেই মানুষের আস্থা। ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দল ভালো করেনি। জয় হয়েছে বাঙালিয়ানার; জাত-পাতের রাজনীতি হরেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদকে বাংলার মানুষ সেভাবে নেয়নি- এটাই স্বস্তির। তবে আগামীতে কী হবে সেটা সময় বলে দিবে।