বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে ভারতের করোনা পরিস্থিতি

বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে ভারতের করোনা পরিস্থিতি - ছবি : সংগৃহীত
ভারতে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই যে বিশ্বে কাঁপন ধরানোর মতো। সংক্রমণ রুখতে লকডাউনই ভরসা, এ তথ্য জানা থাকলেও কোনো দেশই চায় না সে পথে হাঁটতে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বাইডেন সরকারের প্রধান মেডিক্যাল উপদেষ্টা ডক্টর অ্যান্থনি এস ফাউচি জানিয়ে দেন এই পরিস্থিতিতে না চাইলেও অবিলম্বে কয়েক সপ্তাহের জন্য শাটডাউনের পথে হাঁটা উচিত ভারতের। তিনি বলেছিলেন, এই “অত্যন্ত কঠিন” পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য 'তাত্ক্ষণিক এবং দীর্ঘ' পদক্ষেপ নিতে।
ড. ফাউচি এই সাক্ষাৎকারে আমি ভারতের এই পরিস্থিতির সমাধানের সূত্র খুঁজতে চাইছি। ধরা যাক, আপনাকে এই সরকার নিযুক্ত করল স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে, সেক্ষেত্রে আপনি প্রথমেই কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন?
ভারত কী করছে আমি সেটা করব কি না, সে বিষয়ে কথা বলে কোনো সমালোচনায় জড়াতে চাই না। আর সেটিকে নিয়ে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করতেও চাই না। কারণ আমি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিক নই। আমার এটাই মনে হয়েছে যে, এই মুহূর্তে ভারত একটি অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্য থেকে মরিয়া হয়ে লড়াই জারি রাখছে। আমি জানি না এখন ভারত একযোগে বিভিন্ন উপদেষ্টা দল তৈরি করে কাজ শুরু করেছে কি না। সাক্ষাৎকার দেয়ার আগে একটি সংবাদমাধ্যমে দেখছিলাম যে লোকেরা রাস্তায় নেমে অক্সিজেন খুঁজছে। এই লড়াই কঠিন। সাধারণ মানুষের জন্য দেশের জন্যও।
আপনি এই পরিস্থিতিতে কী করতে পরামর্শ দেবেন?
এখন যা অবস্থা সেখানে আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন ইতিমধ্যেই টিকাকরণ শুরু হয়েছে। অক্সিজেনের প্রয়োজন, হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন যদিও সেখানে সমস্যা থাকছে। আর যারা টিকা নিচ্ছে, তাদেরও দু’সপ্তাহ সময় তো লাগবে রোগ প্রতিরোধের জন্য। তাই ওই সময়টা দিতে হবে। অক্সিজেন সঙ্কট মোকাবিলার জন্য কোনো কমিশন বা ইমারজেন্সি গ্রুপ তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশ ভারতকে অক্সিজেন, পিপিই ও ভেন্টিলেটর দিয়ে সাহায্য করছে। এক্ষেত্রে চীনাদের উদাহরণ কিন্তু খুব কাজের। মনে করুন প্রথম যখন করোনা ছড়িয়ে পড়ে ওই সময় কত দ্রুততার সঙ্গে হাসপাতালে জরুরি ইউনিট তৈরি থেকে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো জোরদার করার কাজ করেছিল। যা অবাক করে দেয়ার মতো। এরপর সামরিক বাহিনীর ভূমিকা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। তৎক্ষণাৎ সহায়তা তারাই দিতে পারে। এখন যে কাজই করতে হবে তা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে করতে হবে। হাতে সময় খুব কম। শত্রুপক্ষ (করোনা) হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এখন জরুরি অবস্থা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। যত বেশি লোক টিকা নেবে তত সুস্থ হবে।
করোনার প্রথম ঢেউ নিয়ে আপনার সতর্কবার্তাই বাস্তব হয়েছিল। দ্বিতীয় ঢেউ কী আপনাকে অবাক করছে? আপনি কি আঁচ করতে পেরেছিলেন যে এমনটা হবে?
আমি এই বিষয়ে ভারত সরকারের কী প্রতিক্রিয়া ছিল তা নিয়ে সমালোচনা করতে চাই না। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য আমি করব না।
সমালোচনা করতে বলছি না, কিন্তু বিশ্বজুড়ে কিছু তো লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল?
সবসময় যে প্রাথমিক লক্ষণ থাকবেই এমনটা নয়। এই ভাইরাস কী করতে পারে সেটা আসলে নিজেদের উপলব্ধি হওয়ার কথা। প্রথম ঢেউ দেখিয়েছিল এর মারণ দিক। মার্কিন নাগরিক হিসেবে দেখেছি আমার দেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধনী দেশ। কিন্তু ভাইরাস তো আর ধনী-গরিব মানে না। যদিও আমরা সবভাবে প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু আঘাতও কিছু কম আসেনি। তাই ভাইরাসের মারণ দিকটি কেউ অবহেলা করলে তাকে সমস্যায় পড়তেই হবে। করোনা জয় করে ফেলেছি এটা ভাবা অবান্তর।
বর্তমানে ভারতে ভ্যাকসিন অর্ধেক সরকার দিচ্ছে অর্ধেক খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। টিকার দাম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন মডেলকে সামনে রেখে আপনি কীভাবে দেখছেন এই বিষয়টিকে?
ভ্যাকসিনের সরবরাহ পেতে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ভারত। এখনো অনেক সংস্থা আছে যাদের কাছে ভ্যাকসিন মজুত রয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা যেতে পারে। ১৪১ কোটির দেশ ভারত। অনেক অনেক টিকার প্রয়োজন। তাই চেষ্টা করা উচিত আরো সংস্থার সঙ্গে কথাবার্তা বলে টিকার জোগান বৃদ্ধি করা।
আপনি বলতে চাইছেন এই পরিস্থিতিতে চীন ও রাশিয়ার টিকাও নেওয়া উচিত ভারতের?
হ্যাঁ একদমই তাই। আমি যতদূর শুনেছি এখন পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ ভাগ টিকার ডোজ সম্পূর্ণ করতে পেরেছে। অনেকটা পথ হাঁটা বাকি। দেশের মানুষকে সুরক্ষিত করতে বাকি সব ভাবনা দূরে রাখা ভালো। ভ্যাকসিন জোগার করাই প্রাথমিক লক্ষ্য হোক।
আপনি পদে থাকাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক কোটি আক্রান্ত হয়েছে। কিছু ভাবনা কাজ করেছে, কিছু করেনি। কতটা চ্যালেঞ্জ ছিল সেই পরিস্থিতি?
শাট ডাউন করা খুব দরকার ছিল। দেশের সমস্ত কাজকর্ম থমকে যেত, কিন্তু দরকার ছিল। চীনে যখন প্রথম করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু হয় তখন সম্পূর্ণ লকডাউন করতে বাধ্য হয়েছিল ওরা। বলছি না ছয় মাস ধরে বন্ধ করতে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ করা যায়। প্রাদুর্ভাবের গতিবেগ ও সংক্রমণ হার কমাতে এছাড়া বিকল্প পথ কিন্তু নেই।
সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস