সুয়েজ খালের বিকল্প হবে কি?

সুয়েজ খালের বিকল্প হবে কি? - ছবি : সংগৃহীত
সম্প্রতি এভার গিভেন নামক জাহাজটি সুয়েজ খালে আটকে গেলে নতুন করে বিকল্প পথ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এখন পর্যন্ত তিনটি পথের বিষয়ে জানা গেছে। এক. নেগেভ মরুভূমির ভিতর দিয়ে ১৬০ কি.মি. দীর্ঘ খাল খনন, দুই. এইলাট বন্দর থেকে হাইফা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, তিন. নর্থ-সাউথ করিডোর।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচিত দুটি করিডোরের অবস্থান ইসরাইলের ভূখণ্ডে। ১৯৯৬ সালে আমেরিকার বাণিজ্য দফতরের একটি গোপন নথি প্রকাশিত হয়। সেখানে নেগেভ মরুভূমির তলদেশে ৫২০টি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি করিডোর তৈরির ব্যাপারে বর্ণনা পাওয়া যায়।
২০১২ সালে লোহিত সাগরের তীরবর্তী এইলাট বন্দর থেকে ইসরাইলের হাইফা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করে ইসরাইল সরকার। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। মিসরের আপত্তিতে ইউএই সরে দাঁড়ায়৷ এই প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
আবার কয়েক বছর আগে জাতিসঙ্ঘ সুয়েজ খালের বিকল্প পথ তৈরির জন্য টানেল তৈরিতে বিশেষজ্ঞ একটি কোম্পানি দিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের মধ্যে সুয়েজের বিকল্প একটি পথ তৈরি করা সম্ভব৷ সাম্প্রতিক সুয়েজের ঘটনায় নতুন করে জাতিসঙ্ঘের বাণিজ্যিক রুট সম্পর্কিত কমিটিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সুয়েজে খালের জাহাজ চলাচল বৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় রেখে সিসি সরকার খাল সংস্কারে ২০১৫ সালে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ২০১৬ সালেও সুয়েজ খালের বিকল্প পথ তৈরি নিয়ে জোরোশোরে কথা উঠেছিল। ইয়েমেন যুদ্ধ ও মিসরের কথা বিবেচনা করে ওই আলোচনা ধামাচাপা দেয়া হয়। সাম্প্রতিক আলোচনাও হয়ত থেমে যাবে তবে একেবারে হারিয়ে যাবে না।
ভূ-রাজনীতির খেলায় বারবার সুয়েজ ইস্যু সামনে আসবে। বর্তমানে সিসি সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সখ্য রয়েছে। তবে এই অঞ্চলের অবৈধ সন্তান ইসরাইল সুযোগ পেলেই সুয়েজের বিকল্প পথ তৈরি করতে পিছপা হবে না এটা আঁচ করতে পারা যায়৷ ১৯৫৬ সালের যুদ্ধের ইতিহাস ইসরাইল ভুলে যায়নি। সেই সময় মিসর তিরানা প্রণালী বন্ধ করে দিলে ইসরাইল বেশ বেকায়দায় পড়েছিল। ইসরাইলের রাজনৈতিক উচ্চাবিলাসও কারো অজানা নয়।
আব্রাহাম একর্ডের মাধ্যমে আরব বিশ্বের চারটি দেশের সাথে ইসরাইল সম্পর্ক স্থাপন করেছে। সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিয়েও আলোচনা থেমে নেই। তাই নতুন করে ইসরাইল বিকল্প পথ তৈরিতে উদ্যমী হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বিকল্প পথ তৈরি নিয়ে লণ্ডনের রাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কিত গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রধান এবং মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির বিশ্লেষক সামি হামদি মনে করেন, 'সুয়েজ খালের ওপর মিসরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে শুধু মিসর নয়, আমেরিকার ওপর চাপ তৈরির অবশিষ্ট যে গুটিকয় অস্ত্র আরব বিশ্বের রয়েছে, তাও ভোঁতা হয়ে যাবে।'
নর্থ সাউথ করিডোর মূলত ২০০০ সালে প্রস্তাবিত একটি বহুমুখী রুট। এর দৈর্ঘ্য ৭,২০০ কিলোমিটার। সমুদ্র, রেল ও সড়ক পথের সমন্বয়ে গঠিত এই রুট ভারত মহাসাগরের সাথে পারস্য উপসাগরের মধ্য দিয়ে কাস্পিয়ান সাগরকে যুক্ত করবে।
করিডোরটি ভারতের মুম্বাই বন্দর থেকে শুরু হয়ে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে ইরানের বন্দর আব্বাস ও চাবাহার বন্দর দিয়ে মধ্য এশিয়া, রাশিয়ার সংযোগ ঘটবে। এর কার্যকারিতা অদূর ভবিষ্যতে বাল্টিক অঞ্চল, আর্কটিক অঞ্চল ও নর্ডিক অঞ্চলেও প্রসারিত হবে বলে ধারণা করা হয়।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য মতে এই করিডোর অন্য রুটের তুলনায় ৩০ ভাগ খরচ সাশ্রয় করবে। ঐতিহ্যবাহী সুয়েজ খালের চেয়ে ৪০ ভাগ কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। সাধারণত এশিয়া থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে পণ্য পরিবহনে ৪০ দিন সময় লাগে। এই পথ ব্যবহার করে ২০ দিনেই গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।
এ করিডোরটি মূলত ভারত, রাশিয়া ও ইরানের ত্রিদেশীয় ভাবনার ফুল হিসেবে ফুটেছিল। পরে ফুলের সুবাস পুরো অঞ্চল ছড়িয়ে দিতে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশসহ আরো ছয়টি দেশকে যুক্ত করা হয়েছে। এর কার্যক্রম শ্লথ গতিতে চলছে। পর্যাপ্ত অর্থ যোগান নিশ্চিত না হওয়া ও অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নানামুখী সমস্যা এ করিডোরটির সফলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ করিডোর দিয়ে মাদক চোরাচালান বেড়ে যেতে পারে৷ আবার ইতিহাস বলছে, এ ধরণের আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো শেষ পর্যন্ত প্রথম দিকের মতো সক্রিয়তা ধরে রাখতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ের কথা বলা যেতে পারে। শুরুর দিকে এই রেলওয়ে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করলেও এখন বছরে মাত্র ১০,০০০ কনটেইনার পরিবাহিত হয়।
এছাড়া কাস্পিয়ান অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সমস্যাসহ সামরিক তৎপরতার বর্ণিল উপস্থিতি এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে বাধা হতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মত দিয়েছেন।