তুরস্ক : নতুন শক্তির অভ্যুদয়

এরদোগান - ছবি সংগৃহীত
মুসিলম বিশ্বের নতুন নেতা কি অবশেষে তুরস্কই হচ্ছে? এ প্রশ্ন ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে দেশে দেশে আঙ্কারার অব্যাহত সফল ভূমিকা দেখে। সিরিয়া, লিবিয়া, ভূমধ্যসাগর, ফ্রান্স, ইসরাইল হয়ে শেষ পর্যন্ত আজারবাইজানেও তুর্কি সরকারের সাফল্য প্রসারিত।
সিরিয়াতে যুদ্ধ চলছে সেই ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ থেকে। সে দেশে প্রথমে সংখ্যালঘু সরকার বনাম ইসলামপন্থী’ দ্বন্দ্ব যা বিভিন্নপন্থী বিরোধী দলের মাধ্যমে অন্যরূপ নেয়। পরে এ সঙ্ঘাতে যোগ দেয় সরকার পক্ষে কুর্দি আর বিপক্ষে ‘জঙ্গিরা। একপর্যায়ে রাজধানী দামেস্ক এবং দ্বিতীয় নগরী আলেম্পোসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত রূপ ধারণ করে। দৃশ্যপটে এবার ক্ষমতাসীনদের পক্ষে প্রাক্তন কমিউনিস্ট রাশিয়া এবং বিপক্ষে বর্তমানে ও ক্যাপিটালিস্ট আমেরিকার আবির্ভাব। অন্য দিকে দামেস্ক সরকার কুর্দি জনগোষ্ঠীকে আইএস মোকাবেলায় নামিয়ে দেয় এবং বিদ্রোহী কুর্দি সূত্রে তুর্কিবাহিনীর প্রবেশ ঘটে সিরিয়াতে। ইরান-রাশিয়ার মদদে সিরিয়াতে বাশার আল আসাদের একনায়ক সরকার আপাতত টিকে গেলেও তুরস্কের বিপরীতে তাকে কঠিন সমীকরণের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তুরস্কের সামনে একদিকে, জঙ্গি, অন্য দিকে তুর্কিরা ছিল সমস্যারূপে। তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট ‘ইসলামপন্থী’। তারা স্বদেশে যেমন বিদেশেও তেমনি কুর্দি সন্ত্রাসের ন্যায় আইএসসহ উগ্রবাদ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। সিরিয়াতে বৃহৎশক্তি রাশিয়া ও আমেরিকা থেকে গা বাঁচিয়ে, তদুপরি আঞ্চলিক শক্তি ইরানকে না ক্ষেপিয়ে চলা কঠিন হলেও তুরস্কের এরদোগান সরকার এদিক দিয়ে সফল। প্রমাণিত হয়েছে, তুরস্ক কেবল লাখ লাখ সিরীয় শরণার্থীর গন্তব্য নয়; সেই সাথে সিরিয়া সঙ্কট সুরাহার্থে সফল ভূমিকা অপরিহার্যও।
লিবিয়াতেও তুর্কি সরকারকে সার্থক ভূমিকা দেখা গেছে। সেখানে আরব বসন্তের জের ধরে গণআন্দোলনের পথে দীর্ঘ চার দশকের প্রভাবশালী শাসক মুয়ামার গাদ্দাফির মর্মান্তিক পতন ও মৃত্যু ঘটলেও সে দেশে শান্তি আাসেনি। জাতীয় ঐক্য দূরের কথা। এক দেশে দু’রাজধানী আর দু’টি সরকার কায়েম হলো। একদিকে পশ্চিমাঞ্চলে মূল রাজধানী ত্রিপোলিকেন্দ্রিক জিএমএ বা জাতীয় ঐক্যের সরকার। এর প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে বিদ্রোহী বাহিনীর প্রধান স্বঘোষিত জেনারেল খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয়’ সরকার। এদের ‘রাজধানী’ দ্বিতীয় প্রধান শহর বেনগাজী। ২০১০ সালের প্রথমার্ধে এই বিদ্রোহী সেনারা দেশের প্রায় ১০ শতাংশ দখলে নিয়ে ত্রিপোলির কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল।
আবার কেউ কেউ অবৈধ মানবপাচারের দ্বারা বিপুল অর্থ আয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন এক ঘটনায়, অভিবাসনপ্রত্যাশী বহু বাংলাদেশী নাগরিকের অপমৃত্যু ঘটেছে। এর ধারবাাহিকতায় পাল্টা হামলা ও গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে। এ দিকে জাতিসঙ্ঘ ও তুরস্ক ত্রিপোলি সরকারকে এবং তার মোকাবেলায় রাশিয়া ও ফ্রান্সসহ মিসর-আমিরাত বেনগাজী সরকারকে জোরালো সমর্থন দেয়। ইতালির মৌখিক সমর্থন ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল ‘নিরপেক্ষ।’ আর সৌদি আরব বিদ্রোহীদের পক্ষ নেয়। এ অবস্থায় লিবিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার রাজধানীর চারপাশের এলাকায় সীমিত হয়ে পড়ে। তুরস্কের এরদোগান সরকার এমন পরিস্থিতিতে সাহসের সাথে এগিয়ে এসে বিদ্রোহী বাহিনীকে হঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি উদ্ধার করে। রাশিয়া ও ফ্রান্সের মতো বৃহৎ শক্তির প্রতিপক্ষ হয়ে তুরস্ককে এ কাজ করতে হয়েছে বিরাট ঝুঁকি নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী কয়েকটি রাষ্ট্র এতে বিক্ষুব্ধ হলেও আঙ্কারা পিছ পা হয়নি।
তুরস্কের সাথে একপর্যায়ে রাশিয়ার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। কারণ তুরস্ক একটি রুশ বিমান ধ্বংস করেছিল। কিছু দিনের মধ্যেই সামল্যের সাথে প্রেসিডেন্ট এরদোগান মস্কোকে ম্যানেজ করে নিয়েছেন। এমনতিইে পাশ্চাত্যের প্রতিরক্ষা জোট ‘ন্যাটো’র সদস্য, তদুপরি লিবিয়া সিরিয়াতে রাশিয়ার বিরোধী অবস্থান এ কারণে রাশিয়া তুরস্ককে ভালো নজরে দেখত না। তবে দূরদর্শী সুদক্ষ কূটনীতিক রজব তাইয়েব এরদোগান ন্যাটোর নেতা যুক্তরাষ্ট্রেকে অসন্তুষ্ট করে রুশ অস্ত্রশস্ত্র কিনে এবং অন্যভাবেও সমঝোতা করে রাশিয়াকে বশ করে ফেলেছেন বলেই প্রতীয়মান। অবস্থা এমন হয়েছে যে, বর্তমানে তুরস্ক দেশটি ওয়াশিংটনের সন্দেহের পাত্র আর মস্কোর এক ধরনের মিত্র। একই অবস্থা ইসরাইলের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও।
তুরস্কের সমস্যা হলো, সে মুসলমান অধ্যুষিত হয়েও ভাষালিপিসহ নানা ক্ষেত্রে ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের ঘনিষ্ঠ হতে ইচ্ছুক। তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও অনাবর (দীর্ঘ দিন উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক ছিল ‘দা-কুমড়ো’) তুরস্ক মুসলিমগরিষ্ঠ, তবে ইরানের মতো শিয়া অধ্যুষিত নয়। তুর্কিরা তুর্কিদের সাথে সঙ্ঘাতে লিপ্ত। যদিও উভয়েই সুন্নি। তুরস্কের আরেক সমস্যা, সে মার্কিন জোট ন্যাটোর পুরনো সদস্য হলেও তাকে পাশ্চাত্য ‘বিধ্বস্ত’ মনে করছেন। অপর দিকে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে তুর্কি সদস্য পদ নানান অজুহাতে আজো ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে সে দিকে আপাতত আঙ্কারার আগ্রহ কম বলেই মনে হয়।
ইসরাইলের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক অনেক পুরনো। তবে বিশেষত এরদোগানের দল ক্ষমতায় এলে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটির সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অবরুদ্ধ গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য বেশ কিছু ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছিল তুরস্ক। কিন্তু বিনা উসানিতেই ইসরাইল হামলা চালিয়ে এই ত্রাণ বহরের জাহাজের কয়েকজনকে হত্যা করে। এতে তুরস্ক অনিবার্যভাবেই ক্ষুব্ধ হয়ে তার রাষ্ট্রদূতকে ইসরাইল থেকে প্রত্যাহার করে। ইদানীং দু’দেশের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি সময়ে মুসলিম তুরস্ক ইসরাইল বা ইহুদি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেও নিশ্চয়ই ফিলিস্তিনিদের জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করবে না। ইসরাইলের সাথে আঙ্কারার কূটনৈতিক সম্পর্ক আবর আমিরাত-মিসর-বাহরাইনের সম্পর্কের মতো আপসকামী হচ্ছে না। অর্থাৎ, এরদোগান ইসরাইলের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখতে চান।
সম্প্রতিককালে পাশ্চাত্যের বৃহৎশক্তি ফ্রান্সের সাথে আঞ্চলিক শক্তি তুরস্কের দ্বন্দ্ব সারা পৃথিবীর দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। ভূমধ্য সাগরে জ্বালানি অনুসন্ধান নিয়ে এ সাগরের দ্বীপ দেশ সাইপ্রাস ও তীরবর্তী গ্রিসের সাথে বিবাদ বাঁধে তুরস্কের। তখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তীব্র সমালোচনা করেছেন তুর্কি নেতা রজব তাইয়ের এরদোগানের। ধারণা করা হয়, ‘ইলামপন্থী’ এরদোগানের এই বিরোধিতার সূত্র অভিন্ন খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী হওয়া। তবে তুরস্ক ভয় না পেয়ে দৃঢ়তা অবলম্বন করে সমুদ্রে জ্বালানি সন্ধানের বিষয়ে। এরপর ঘটে যায় ফ্রান্সে মহা নবী সা: কার্টুন সংশ্লিষ্ট অঘটন। কয়েক বছর আগে ‘শার্লি এবদো’ পত্রিকায় প্রকাশিত, নবীজী সা:-এর অবাঞ্চিত কার্টুন নিয়ে বাড়াবাড়ির জের ধরে হত্যাকাণ্ড এবং এ জন্য পাইকারিভাবে সব মুসলিমকে দায়ী করা নিয়ে ফরাসি সরকারের সাম্প্রতিক বাড়াবাড়ি ছিল অতীব দৃষ্টিকটু। তখন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের ‘মানসিক চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেন এবং ফরাসি নেতাও তার প্রচণ্ড সমালোচনা করেছেন। তবে ফ্রান্স-তুরস্ক সম্পর্ক তলানিতে গেলেও আবার আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ‘প্রিয়ভাই’ বলে সম্বোধন করে চিঠি দিয়েছেন এরদোগানকে।
তুরস্কের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের এ স্বীকৃতির সর্বশেষ নজির হলো, আজারবাইজান কর্তৃক তুর্কি সহযোগতিায় নাগোরনো-কারাবাখ ছিটমহল পুনরুদ্ধারের পরে মস্কো-আঙ্কারা যৌথ সেনা টহলদারির সিদ্ধান্ত। অথচ রুশ ঘনিষ্ঠ ইরানের মতো শিয়া মতাবলম্বী হচ্ছে আজারবাইজানের জনগণ। কিন্তু সেখানে ইরান ছিল অনেকটা নীরব।
যাই হোক, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান স্বদেশ-বিদেশ নির্বিশেষে অসাধারণ ঈৎরংরং গধহমবসবহঃ-এর প্রমাণ দিয়ে তুরস্ককে আন্তর্জাতিক শক্তির শানে উন্নীত করেছেন।