শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান : সব খাতেই পিছিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান : সব খাতেই পিছিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা - ছবি : সংগৃহীত
আরএসএস তথা বিজেপির রাজনৈতিক ঝুলি থেকে যদি মুসলমান-বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা তুলে নেয়া হয়, তবে তাদের হাতে কংগ্রেসের তৈরি পেনসিল বাদ দিয়ে আর খুব বেশি কিছু পড়ে থাকে না। তাই বিজেপি যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সংখ্যালঘু সমাজের বিরুদ্ধে লাগাতার কুৎসা প্রচার করবে, এবং তাদের এই দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার স্লোগান তুলবে, এই বিষয় কোনো সন্দেহ ছিল না।
এই মুসলমান-বিরোধী আখ্যানের কয়েকটি কেন্দ্রীয় বিন্দু রয়েছে। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে নাকি মুসলিম জনসংখ্যা হুহু করে বাড়ছে এবং অচিরেই তা হিন্দুদের থেকে বেশি হয়ে যাবে। এই সংবাদপত্রের পাতায় আগেও লিখেছি যে, মুসলমানদের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার হিন্দুদের তুলনায় বেশি হলেও তা লাগাতার কমছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে সার্বিক জন্মহার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর, অর্থাৎ একজন মহিলা তাঁর জীবনে গড়ে মোট যতগুলি সন্তানের জন্ম দেবেন) ধর্মনির্বিশেষে লাগাতার কমছে। হিন্দুদের মধ্যে এই হার ২০০১ সালে ছিল ২.২, ২০১১-তে তা কমে হয় ১.৭ এবং ২০১৫-১৬ সালে তা আরো কমে হয় ১.৬। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ২০০১ সালে জন্মহার ছিল ৪.৬, যা মাত্র দশ বছরে কমে হয় ২.২ এবং ২০১৫-১৬ সালে হয় ২.১। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে জন্মহারের পতনের পরিমাণ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। কাজেই, অনেক বেশি সংখ্যক সন্তান প্রসব করে মুসলমানরা রাজ্যে জনসংখ্যায় হিন্দুদের ছাপিয়ে যাবেন, কথাটা স্রেফ অপপ্রচার।
আর একটি প্রচারও রাজ্যের রাজনীতিতে কান পাতলেই শোনা যায়— মুসলমান তোষণ। মুসলমান সমাজের মানুষদের নাকি বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেয়া হচ্ছে। যদি সত্যিই তা-ই হতো, তবে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক মানবোন্নয়ন সূচকে মুসলমানদের অবস্থা উন্নত হতো এবং তারা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যেতেন। তথ্য কিন্তু সে কথা বলছে না। প্রথমে তাকানো যাক কর্মসংস্থানের দিকে। ২০১৮-১৯ সালের কেন্দ্রীয় সরকার প্রদত্ত কর্মসংস্থান রিপোর্টের ব্যক্তি-স্তরের তথ্য বিশ্লেষণ এবং গণনা করে দেখা যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান এবং হিন্দুদের মধ্যে বেকারত্বের হার যথাক্রমে ৩.৭ এবং ৩.৮ শতাংশ। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ৬.৮ এবং ৫.৭ শতাংশ। অর্থাৎ, বেকারত্বের নিরিখে রাজ্যে মুসলমান এবং হিন্দুদের মধ্যে কোনো তফাত নেই, এবং উভয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই এই হার দেশের তুলনায় কম।
কর্মসংস্থানের অন্যান্য সূচকের দিকে তাকানো যাক। পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত মুসলমানদের মধ্যে ৫২.৭ শতাংশ স্বনিযুক্ত শ্রমিক, হিন্দুদের মধ্যে যা ৪৭.৩ শতাংশ। মুসলমান কর্মরত মানুষের মাত্র ১৩ শতাংশ নিয়মিত বেতনের চাকরি করেন, হিন্দুদের মধ্যে যা ২৪.২ শতাংশ। উল্লেখ্য, ভারতে ২২.১ শতাংশ মুসলমান শ্রমিক নিয়মিত বেতনের ভিত্তিতে কাজ করেন। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গে নিয়মিত বেতনের চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানরা শুধু যে রাজ্যের হিন্দুদের চেয়ে পিছিয়ে আছেন তা নয়, তারা ভারতের মুসলমান সমাজের চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। রাজ্যে মুসলমান কর্মরত শ্রমিকের মধ্যে ঠিকা শ্রমিকের অনুপাত ৩৪.৩ শতাংশ, হিন্দুদের মধ্যে যা ২৮.৫ শতাংশ। গোটা ভারতে ঠিকা শ্রমিকের কাজ করেন ২৫.৭ শতাংশ মুসলমান কর্মরত মানুষ। অর্থাৎ, এই রাজ্যে মুসলমান সমাজের মানুষের অধিকাংশ স্বনিযুক্ত শ্রমিক এবং ঠিকা শ্রমিকের কাজ করেন। নিয়মিত বেতনের শ্রমিকের সংখ্যা খুবই কম। রাজ্যে মুসলমানদের মধ্যে ৩১ শতাংশ মানুষ কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত রয়েছেন, নির্মাণশিল্পে রয়েছেন ২৬ শতাংশ। কিন্তু এই ২৬ শতাংশ শিল্পে কর্মরত মানুষদের বেশির ভাগই বিড়ি তৈরি এবং অন্যান্য অসংগঠিত শিল্পে কর্মরত রয়েছেন। অতএব, তাদের মজুরি ও আয় কম হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
শ্রমিকদের মাসিক বেতন বা আয়ের দিকে তাকালে আরো পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। যেমন, রাজ্যে মুসলমান স্বনিযুক্ত শ্রমিকদের মাসিক আয় ২০১৮-১৯ সালে ছিল ৬১৯৭ রুপি, হিন্দুদের ক্ষেত্রে যার পরিমাণ ৭৫৮৬ রুপি। ভারতের ক্ষেত্রে মুসলমান এবং হিন্দুদের স্বনিযুক্ত শ্রমিকদের আয় যথাক্রমে ১০১৯২ রুপি এবং ১০৬৩৭ রুপি। অর্থাৎ, এক দিকে রাজ্যের মুসলমান স্বনিযুক্ত শ্রমিকেরা হিন্দুদের তুলনায় কম টাকা রোজগার করেন; অন্য দিকে, হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শ্রমিকরাই ভারতের তুলনায় কম রোজগার করেন। একই ছবি দেখা যাবে নিয়মিত বেতনের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। রাজ্যে মুসলমান সমাজের এই শ্রমিকদের মাসিক আয় ৯৪৬০ রুপি, যা হিন্দুদের ক্ষেত্রে ১১৯৪৪ টাকা। সমগ্র দেশে হিন্দু ও মুসলমান নির্বিশেষে এই গড় আয়ের পরিমাণ পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশি। ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে রাজ্যে মুসলমান শ্রমিকদের আয় হিন্দুদের তুলনায় বেশি, যা ভারতের ক্ষেত্রেও সত্যি। কিন্তু দিনমজুর হয়ে আয় বেশি হল না কম হলো, তা উন্নয়নের সূচক হতে পারে না। যে সমাজের অধিকাংশ মানুষ ঠিকা শ্রমিক হয়ে জীবনযাপন করেন, যেখানে না আছে আয়, না আছে সামাজিক নিরাপত্তা— সে সমাজের কর্মসংস্থানের মান নিশ্চিতভাবেই অন্যদের থেকে কম হবে।
অ্যাসোসিয়েশন স্ন্যাপ এবং গাইডেন্স গিল্ড, প্রতীচী ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ২০১৬ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্টে সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে তারা জানাচ্ছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে ৬৪.৭ শতাংশ মুসলমান পরিবার দারিদ্ররেখার নিচে অবস্থান করছে। স্ন্যাপ গিল্ডের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ বাংলার ৪৭ শতাংশ মুসলমান মানুষ হয় খেতমজুর, বা দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। ভালো চাকরির অভাব, কাজের অভাব, ঠিকা শ্রমিক হয়ে দিন গুজরান করার ফলে মুসলমান সমাজে দারিদ্রের এত প্রাবল্য। এই মানুষগুলি যেখানে দিনরাত দারিদ্রের সঙ্গে লড়ছেন, তখন তাদের তোষণ করা হচ্ছে বলে যারা দাবি করছেন, তারা কোনো রাজনীতি করতে চাইছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
শিক্ষাক্ষেত্রের দিকে নজর ঘোরালে দেখা যাবে যে, ২০১১ সালের জনগণনা রিপোর্ট অনুযায়ী, মুসলমানদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬৮.৭ শতাংশ, যেখানে রাজ্যের গড় সাক্ষরতার হার ৭৬.৩ শতাংশ। স্ন্যাপের পূর্ব-উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুসলমানদের মধ্যে স্নাতক ছিলেন মাত্র ২.৭ শতাংশ। যেকোনো সমাজের উন্নয়নের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চশিক্ষা সমীক্ষার ২০১৮-১৯ সালের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮-১৯ সালে রাজ্যের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট মুসলমান শিক্ষকের অনুপাত মাত্র ৬.৯ শতাংশ। এখানে উল্লেখ্য, ২০১২-১৩ সালে এই অনুপাত ছিল আরো কম, ৩.৯ শতাংশ।
২০১৮-১৯ সালে রাজ্যের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যেমন যাদবপুর, কলকাতা এবং প্রেসিডেন্সিতে মুসলমান শিক্ষকের সংখ্যা যথাক্রমে ৮, ১৯ এবং ১৭। রাজ্যের কলেজগুলোতে ২০১৮-১৯ সালে শিক্ষকদের ৭.৮ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, ২০১২-১৩ সালে যা ছিল ৩.১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের ১৪ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের, কলেজের ক্ষেত্রে যা ১২.৫ শতাংশ। আবারো কিছু বিখ্যাত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমান ছাত্রদের সংখ্যা নগণ্য। মনে রাখতে হবে, রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে ২৭ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। অথচ, রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম। যতটুকু প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে, তা ওবিসি সংরক্ষণের আওতায় মুসলমানদের পিছিয়ে পড়া অংশকে সংরক্ষণ দেয়ার জন্য হয়েছে বলে মনে হয়। উপরের তথ্য প্রমাণ করছে, শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমান সমাজের মানুষেরা পিছিয়ে রয়েছেন। সত্যিই মুসলমান তোষণ হলে কি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো?
শেষে তাকানো যাক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে। স্ন্যাপ-গিল্ড প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে সমস্ত ব্লকে মুসলমান জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশের কম, সেখানে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য ২.৩ হাসপাতাল রয়েছে। অথচ, যে-সমস্ত ব্লকে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি মুসলমান মানুষের বাস সেখানে প্রতি লাখ মানুষের জন্য হাসপাতাল রয়েছে মাত্র ১.৪। হাসপাতাল বেডের সংখ্যাও মুসলমান মানুষের জনসংখ্যার অনুপাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ব্লকে কমছে। স্বাস্থ্যের বিভিন্ন পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে মুসলমান এলাকায়, এই তথ্যই উক্ত প্রতিবেদন থেকে উঠে আসছে।
রাজ্যের মুসলমানরা পিছিয়ে রয়েছেন বিভিন্ন সূচকে। একটি গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থায় পিছিয়ে-পড়া শ্রেণির মানুষের উন্নয়ন করা সরকারের দায়িত্ব। তা নিয়ে সদর্থক আলোচনা না করে যারা তোষণ দেখতে পাচ্ছেন, তারা তথ্যনির্ভর আলোচনা নয়, ভরসা রাখছেন হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে।
অর্থনীতি বিভাগ, ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা