কী হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে?

মোহাম্মদ ও নেতানিয়াহু - ছবি : সংগৃহীত
২০২১ সালের মধ্যপ্রাচ্য কেমন হবে তার প্রতি সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্পের আমলে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে আমেরিকার সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বরাবরই প্রভাব ছিল ইসরাইলের। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইসরাইলের স্বার্থ অনেকখানি আমেরিকান স্বার্থে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শর্ত বানানো হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পথ ধরে বাহরাইন, সুদান ও সর্বশেষ মরক্কো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। বাইডেন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নতুন করে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার চাপ সৃষ্টি করা না-ও হতে পারে যদিও আমেরিকান নীতি প্রণয়নে ইসরাইলের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
একটি বিষয় নিয়ে এখন ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদায় নেয়ার আগে ইরানের ওপর সামরিক হামলা পরিচালনা করতে পারেন। এটি করা হলে তা হবে ইসরাইলের স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ পদক্ষেপ। ইসরাইলে দুই বছরের মধ্যে চতুর্থবার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে নেতানিয়াহু জয়ী হোন, তা ডেমোক্র্যাট নেতারা চান না বলেই মনে হয়। ট্রাম্প ইরানে হামলা চালালে দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্কে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র পামাণবিক চুক্তিতে ফেরার বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী ফাখরিনেজাদকে হত্যা করে এক দফা উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু এই উসকানিতে ইরান পা না দেয়ায় সেটি সফল হয়নি। এখন নতুন কোনো অজুহাত সৃষ্টি হলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ ব্যাহত হতে পারে। তবে বাইডেন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর ইরানের ওপর আমেরিকান চাপ চলে যাবে এমনটি মনে হয় না।
ইরান ইসলামী বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বতন্ত্র একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। পশ্চিমারা এটিকে থিওলজিক্যাল পলিটিক্যাল ইসলাম বা এ ধরনের কিছু দিয়ে চিহ্নিত করতে চায়। বাস্তবতা হলো- অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের গণতন্ত্র ও শিয়া ইমামত ব্যবস্থার মিশ্রণে একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি ইরানে তৈরি হয়েছে। এটিকে সার্বজনীন রাজনৈতিক মডেলে রূপ দেয়া মুসলিম দেশগুলোর জন্য সম্ভব বলে মনে হয় না। ফলে ইরানকেন্দ্রিক যে শক্তির অভ্যুদয় সেটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র হতে পারে, কিন্তু মুসলিম বিশ্বের মূল নেতৃত্ব ইরানের হাতে যাবে না জনসংখ্যা বাস্তবতার কারণে। বিশ্বে মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ সুন্নি আর ২০ শতাংশ শিয়া। ফলে সুন্নি জনগণ ইরানকে একক নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। অন্য দিকে আমেরিকার সর্বাবস্থায় বৈরীসুলভ নীতির (ব্যতিক্রম আফগানিস্তানে তালেবান, ইরাকে সাদ্দাম ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী তৎপরতায় সহযোগিতা) কারণ ইরানকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে চীন ও রাশিয়ার অধিকতর নিকটবর্তী করেছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তিতে পুনঃপ্রবেশ না করলে ইরানের চীন-রাশিয়া নির্ভরতা আরো বাড়তে পারে।
ইসরাইল মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে দুনিয়ার একটি অংশে প্রভাব বিস্তারের যে কার্যক্রম শুরু করেছে তা আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহু জয়ী হোক বা না হোক পুরোপুরি পরিত্যক্ত হবে না। দেশটি আরব বিশ্বের মধ্যে সৌদি স্বীকৃতি লাভের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে, বাদশাহ সালমানের রাজত্বকালে যেটি অর্জন প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। অনারব মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে চারটি দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তেলআবিব। এর মধ্যে চারটি দেশের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে- পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ। বড় কোনো অঘটন না ঘটলে পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। বাকি দু’টি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অদূর ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে দু’টি দেশেই মধ্যবর্তী একটি নির্বাচন অনিবার্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।